৩০শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | সোমবার, ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

মাগুরার মহম্মদপুরের বিনোদপুরে ভাই-বোনের রহস্যজনক মৃত্যু

প্রকাশিতঃ আগস্ট ১৭, ২০২০, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ



মাগুরা প্রতিনিধি: মাগুরার মহম্মদপুরের বিনোদপুরের মোল্যা পাড়ায় ভাই-বোনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে পুলিশ, চিকিৎসক, বাবা-মা ও স্বজনেরা খাদ্যে বিষক্রিয়ায় তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারনা করছেন। তবে কীভাবে খাবারে বিষ আসল সে সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে পারছেন না।

রোববার (১৬ আগস্ট) সকাল পৌনে আটটার দিকে শিশু পুত্র শিমুল (১২) মাগুরা সদর হাসপাতালে মেয়ে আরিফিন (২০) বেলা পৌনে তিনটার দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়।

সরেজমিন ঘটনাস্থলে গিয়ে সবার সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিনোদপুরের মোল্যা পাড়া গ্রামের বাসিন্দা আরজু মোল্যা (৪০) পেশায় প্রান্তিক কৃষক। স্ত্রী শ্যামলী বেগম গৃহিনী। তাদের বড় মেয়ে আরিফিন বিনোদপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এবছরের এইচএসি পরীক্ষার্থী। ছেলে শিমুল (১২) বিনোদপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র।

শনিবার (১৫ আগস্ট) রাত পৌনে আটটার দিকে পরিবারের বাবা-মা দুই ছেলে মেয়ে ও দাদি মিলে মিষ্টিকুমড়ো ও ডিমের ঝোল দিয়ে রাতে ভাত খায়। চারজন একসাথে রান্না ঘরে বসে ভাত খায়। দাদি আনোয়ারা বেগম অসুস্থ্য থাকায় তাঁর খাবার ঘরে পৌঁছে দেওয়া হয়।

খাবার খেয়ে ছেলে বাবা-মায়ের কাছে আর মেয়ে দাদির কাছে ঘুমিয়ে পড়ে।

মা আনোয়ারা বেগম জানান, ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে স্কুলের অনুষ্ঠান শেষে বিনোদপুর প্রধান সড়কের পাশে আহম্মদ বিশ্বাস ওরফে মাধো নামের এক ক্ষুদ্র মুদি দোকানদারের কাছ থেকে ২৫০ এম.এল বোতলের একটি কোম্পানীর কোমল পানীয় কিনে বাড়িতে নিয়ে আসে। পানীয় ছেলেকে পান করতে দেখলেও মেয়েকে পান করতে দেখেননি বলে জানান।

পুলিশ জানান, তারা বাড়ি থেকে একটা কোমল পানীর খালি বোতল জব্দ করেছেন। তবে সে পানীয় মেয়াদোত্তীর্ণ নয়। চলতি বছরের নভেম্বর মাস পর্যন্ত মেয়াদ আছে।

রাত আনুমানিক সাড়ে এগারোটার দিকে ছেলের পেটে তীব্র ব্যাথা শুরু হয়। মুখ দিয়ে ফেনা জাতীয় তরল পদার্থ বের হতে থাকে। বিনোদপুরে গ্রাম্য ডাক্তার রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রাথথিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসে। এর মধ্যে মেয়েরও একই উপর্সগ দেখা দেয়। ছেলের অবস্থার অবনতি হলে ১৬ আগস্ট ভোরে মাগুরা সদর হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। এর মধ্যে বাড়িতে মেয়ের অবস্থা অবনতি হলে এমবুলেন্সে মাগুরা থেকে ফরিদপুর নেওয়ার পর একই দিন বিকেলে তার মৃত্যু হয়।

পরিবারের ৪/৫ জনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, একই খাবার সবাই খেলেও বাবা-মা ও দাদির কোন সমস্যা হয়নি।

একটি সূত্র বলছে, ধান খেতে দেওয়ার জন্য কোন গন্ধবিহীন কোমলপানীয়ের খালি বোতলে এনে রাখা কীটনাশক দুই ভাইবোন ভুল করে ভাগাভাগি করে খেয়ে ফেলার বিষয়টি ওড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকে। তবে মেয়েটি অসুস্থ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত স্বজনদের বললেও কোন কিছু খাওয়ার কথা বলেনি বলে তারা জানান।

দোকানদার আহম্মদ বিশ্বাস জানান, পুলিশের উদ্ধার করা ব্রান্ডের পানীয় তিনি বিক্রি করেন না। উদ্ধার হওয়া কোম্পানী বাদে পুলিশ তার দোকানে তিনটি ব্রান্ডের ১০/১২টি বোতল দেখতে পেয়েছেন।

সরেজমিনে আরজু মোল্যার বাড়ি গিয়ে দেখা গেছে, তিনি মূল গোষ্ঠী থেকে সরে এসে বিনোদপুর মোল্যা পাড়ায় মাঠের পাশে ফাঁকা জায়গায় বাড়ি করছেন।একটি সরকারি ঘর পেয়েছেন। আরেকটি টিনের ঘরে তিনি সপরিবারে বাস করেন। আসপাশে কয়েকশ গজের মধ্যে কোন বসত বাড়ি নেই। চারদিক বিস্ত্রীর্ণ ফসলের মাঠ। বাড়ির উপর বিভিন্ন গ্রাম থেকে শতশত মানুষ ভিড় করছেন। স্বজনদের আহাজারিতে বাড়ির পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে।হৃদয়বিদারক এই ঘটনায় চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি অনেকে। বারবার র্মুছা যাচ্ছেন বাবা-মা, দাদি ও স্বজনেরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেয়ে আরেফিনের (২০) প্রায় কয়েক বছর আগে মাগুরার পারনান্দুয়ালি এলাকার তৌহিদ মন্ডলের ছেলে রাজুর সাথে বিয়ে হয়। ৫/৬ মাস পর তাদের সংসার ভেঙে যায়। মেয়েটি কলেজে পড়ত তার স্বামী তাকে পড়তে দিতে চাইত না। এই নিয়ে তাদের প্রায়ই ঝগড়া হতো।
চিকিৎসকের একটি সূত্র জানিয়েছে, যেভাবেই হোক তাদের পাকস্থলীতে খাবারের সাথে উচ্চ মাত্রার
কীটনাশক গেছে।

শিশুপুত্র শিমুলের লাশ ময়না তদন্ত শেষে আজ সন্ধ্যায় বিনোদপুর ঈদগাহ-গোরস্থানে জানাজা ও দাফণ সম্পন্ন হয়েছে। আরিফিনের লাশ ময়না তদন্তের জন্য মাগুরায় পাঠিয়েছে পুলিশ।

বাবা আরজু মোর‌্যা জানান, এ ঘটনায় তিনি কাউকে সন্দেহ করতে পারছেন না। তার কোন শত্রু নাই বলে জানান।

দাদি আনোয়ারা বেগম বলে, সবাই একই খাবার খাইছে। ওরা দুইজন মরল আমরা মরলাম না ক্যা ?

মাগুরার সহকারি পুলিশ সুপার আবীর শুভ্র (সার্কেল) জানান, লাশের ময়না তদন্ত হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে।

Leave a Reply