২৭শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | শুক্রবার, ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

‘ধরেই নেয়া হয় রোগীর গায়ে হাত তোলা যায়’

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ১৫, ২০২০, ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ



‘ধরেই নেয়া হয় রোগীর গায়ে হাত তোলা যায়’। ছবি সংগৃহীত

পঁচাত্তর রিপোর্ট:
ঢাকায় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে মানসিক চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়ে পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুর পর মানসিক রোগীদের সঙ্গে আচরণের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশে মানসিক সমস্যায় হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, মারপিট এবং শারিরীক নির্যাতন একটা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন ভুক্তভোগীরা।

মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়ে এখন সুস্থ্য আছেন এমন দুজন তাদের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন।

ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা

দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দেয়ার পর মারাত্মক মানসিক সংকটে পড়া নাদিয়া সারওয়াত সপ্তাহখানেকের জন্য ক্লিনিকে ভর্তি হয়ে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। ওই ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়ে নাদিয়া সুস্থ্য হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু মার খাওয়ার অভিজ্ঞতা ভুলতে পারেননি।

‘পোস্ট পার্টাম সাইকোসিস বা বেবি ব্লু নামে পরিচিত মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলাম। বাসায় থেকে চিকিৎসা নেয়া সম্ভব হচ্ছিল না তাই ক্লিনিকে ভর্তি হই। যে কয়দিন ছিলাম রাতে আমার ঘুম হতো না। কোথায় আছি, কেন আছি কিছু বুঝতে পারতাম না। বাচ্চাকে খুঁজতাম ঘুরে ঘুরে। নার্সদের কাছে বার বার গিয়ে জিজ্ঞেস করতাম। আসলে আমি ভুলে যেতাম যে আমি হয়তো ৫ মিনিট আগেই তাকে আরেকবার নক করেছি। তো নার্স বিরক্ত হয়ে একপর্যায়ে আমাকে চিৎকার করে বলে- ‘যান এখান থেকে’ আর ঘুষি মারে আমাকে।’

নিজের অভিজ্ঞতা এবং পর্যবেক্ষণ থেকে নাদিয়া সারওয়াত বলেন, পরিস্থিতি দেখে মনে হয় মানসিক রোগীর সঙ্গে দুর্ব্যবার করাটাই যেন স্বাভাবিক বিষয়।

‘রোগীকে গায়ে হাত তোলা কীভাবে সম্ভব? যেখানে আমার চিকিৎসা হচ্ছে। সেখানে চিকিৎসা নিয়েই কিন্তু আমি সুস্থ্য হয়েছি। তার মানে যে হাসপাতালটা প্রতিষ্ঠিত, রোগীদের সুস্থ্য করছে তারাও রোগীদের সঙ্গে এভাবে ট্রিট করছে। ধরেই নেয়া হয় যে মানসিক রোগী হলে গায়ে হাত তোলা যায়।’

পরিচয় গোপন রেখে আরেকজন ভুক্তভোগী জানান, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে তাকে প্রথমেই শান্ত করতে মেঝেতে চেপে ইনজেকশন দেয়া হয়। সম্প্রতি একটি ক্লিনিকে নিহত পুলিশ কর্মকর্তার ভিডিও দেখে এই ভুক্তভোগী বলেন, তাকেও একইভাবে মেঝেতে চেপে ধরা হয়েছিল।

‘ওনারা আমাকে একইভাবে মেঝেতে চেপে ইনজেকশন দেয়। ওই সময় এতটা বাধার সৃষ্টি হয়েছিল যে দুই তিনজন আমার দ্বারা আহত হয়েছিলেন বলে জেনেছি। ব্যাপারটা হচ্ছে এরকম, তাদের এটা তাদের একটা ট্রেডিশন বলেই মনে হয়েছে যে যখনই কোনো নতুন রোগী ভর্তি করে তাকে ফিজিক্যালি ডোমিন্যান্স নিয়ে নেয় যাতে রোগী পরে কোনোরকম বাড়াবাড়ি না করে।’

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ব্যক্তি নিজেও একজন চিকিৎসক। সামর্থ্য থাকায় তিনি বিদেশে সেবা নিয়ে সুস্থ্য হয়েছেন।

‘আমি বলবো যে বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে সেটা অত্যাধুনিক না। সাধারণত সিডেটিভ দিয়ে অথবা হিপনোটাইজিং কোনো একটা ড্রাগ দিয়ে রোগীকে সারাদিন বিছানায় ফেলে রাখাটাই হচ্ছে আমাদের দেশে একটা কমন ট্রেন্ড।
দেশের বাইরে গিয়ে মনে হয়েছে যে তাদের কাউন্সিলিং এবং আচরণ আমার অর্ধেক রোগ সারিয়ে তুলেছে।’

ওই ভুক্তভোগী চিকিৎসকের ভাষায়,‘আমি নিজেও একজন ডাক্তার আমি বুঝেছি যে আমার কী ক্ষতিটা করা হয়েছে। বাংলাদেশে চিকিৎসায় আমার কী ক্ষতি হয়েছে সেটা আমার চেয়ে বেটার আর কেউ বুঝে নাই।’

ভারসাম্যহীন রোগী নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি

এদিকে বাস্তবতা হলো মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে রোগীরা অনেকসময় চরম সহিংস হয়ে ওঠেন। তাদেরকে সামলাতে চিকিৎসার অংশ হিসেবেই ওষুধ প্রয়োগের পাশাপাশি কিছু বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি রয়েছে।

মনরোগ চিকিৎসক মেখলা সরকার বলছেন,‘ওষুধ দেয়ার পরও যখন ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না সেক্ষেত্রে রেস্ট্রেইনের ব্যাপার রয়েছে। ফিজিক্যাল রেস্ট্রেইনটা হলো চিকিৎসার একটা অংশ। এটা রোগীর মর্যাদা সম্মান নিশ্চিত করেই এটা করতে হয়।
এক্ষেত্রে যাতে রোগী ব্যাথা না পায়, শিকল দড়ি দিয়ে বেধে নয়। রেস্ট্রেইন করার আলাদা ব্যান্ড পাওয়া যায় বা আলাদা জ্যাকেট আছে সেটা পরিয়ে রোগীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।’

মেখলা সরকার বলেন, মানসিক রোগীদের সেবার জন্য দক্ষ প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী দরকার হয়। এটা বাংলাদেশে একটা বড় সংকটের জায়গা।

‘আমাদের যারা ওয়ার্ড বয়, নার্সরা আছেন যেহেতু অ্যাগ্রেসিভ রোগীদের সামলাতে হয়। তাদের ওপরেই প্রধান চাপ থাকে। অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় বেশিদিন তারা এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে থাকতে চায় না। প্রতিনিয়ত বদলাতে থাকে তাই তাদেরকে যথাযথ প্রশিক্ষিত ও দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে তৈরি করার সুযোগটা কম থাকে। এটা একটা বিরাট বড় সীমাবদ্ধতা।’

মানসিক স্বাস্থ্য খাতে অবহেলা আর সংকট

এদিকে বাস্তবতা হলো পরিস্থিতি একেবারেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না গেলে কাউকে মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয় না। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের দেয়া তথ্যে বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১৮.৫ শতাংশ এবং শিশু কিশোরদের ১২.৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। তবে কুসংস্কার অজ্ঞতা আর সুযোগ কম হওয়ায় থাকায় মানসিক রোগীদের শতকরা ৯২ ভাগই থাকেন চিকিৎসা সেবার বাইরে।

সারাদেশে মানসিক রোগের চিকিৎসা দেয়ার জন্য পর্যপ্ত সুযোগ সুবিধা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার দিকটি বড় অবহেলার শিকার।

‘ভীষণ অবহেলা ছিল এখানে। যেমন আমাদের হেলথ বাজেটের মাত্র (দশমিক দুই শতাংশ) জাতীয় বাজেটের কথা বলছি না স্বাস্থ্যখাতের বাজেটের মাত্র .২% খরচ করা হতো। এখন কিছুটা বেড়েছে। এত বছরে আমরা মাত্র দুইশর কিছু বেশি সাইক্রিয়েটিস্ট তৈরি করতে পেরেছি। যা দরকার এটা তার তুলনায় খুবই কম’।

মানসিক রোগের চিকিৎসায় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং পাবনা মানসিক হাসপাতালের বাইরে মেডিকেল কলেজগুলোতে কিছু চিকিৎসা সুবিধা আছে যা পর্যাপ্ত নয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং পাবনা মানসিক হাসপাতালের দীর্ঘসময় পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক হেদায়েতুল ইসলাম।

বাংলাদেশে অর্ধশতাব্দীর বেশি মানসিক চিকিৎসা সেবার সঙ্গে যুক্ত এই বিশেষজ্ঞ জানান মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র হিসেবে ১৬৮টি বেসরকারি ক্লিনিক মানসিক রোগেরও চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে যেগুলো মানসম্মত নয়।

“প্রত্যন্ত অঞ্চলে সুযোগ সুবিধা বাড়ানো উচিৎ। সবচে বড় কথা হলো সেবার মাধ্যমেই আমাদের এটাকে জনপ্রিয় করতে হবে। যে কুসংস্কার এবং প্রেজুডিস যেগুলো চালু আছে সেগুলো দূর করতে বহু সময় লাগে। আমার জীবনের তো আমি ষাট বছর কাটিয়ে দিলাম এর পেছনে। তাতে দেখা যাচ্ছে যে এখন উন্নতি বেশ কিছুটা হয়েছে কিন্তু সুযোগ নাই, সুযোগটা সীমিত’, বলেন মি. ইসলাম।

এদিকে যেটুকু সুযোগ সুবিধা আছে সেখানে মানসিক রোগের মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে যথাযথ নজরদারির প্রশ্ন রয়েছে। সেটি যথাযথ হচ্ছে না সেটি পুলিশ কর্মর্তার মৃত্যুর ঘটনায় স্পষ্ট।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকেও স্বীকার করা করা হচ্ছে যে পর্যাপ্ত লোকবল না থাকায় যথাযথ মনিটরিং সম্ভব হচ্ছে না। সূত্র : বিবিসি

Leave a Reply