২৭শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | শুক্রবার, ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

চাকুরীচ্যুত বিজেএমসির ক্রীড়াবিদদের মানবেতর জীবন

প্রকাশিতঃ জুলাই ১০, ২০২০, ৬:৫৪ অপরাহ্ণ




পঁচাত্তর রিপোর্ট
২০২০ সালের জানয়ারী মাস। হঠাৎই এক ঘোষণায় মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো বিজেএমসির বদলী শ্রমিক কোটায় চাকুরী করা ক্রীড়াবিদদে। মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা, আর কোনো বদলী শ্রমিককে চাকুরীতে রাখবে না বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন বা (বিজেএমসি)। এই কাতারে পড়েন ক্রীড়াঙ্গনে প্রতিষ্ঠানটির মুখ উজ্জ্বল করা ৩৪৬ জন ক্রীড়াবিদ। তাদেরও চাকুরী চলে যায়। আর এখন পাটকল গুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাকুরী চলে গেছে স্থায়ী শ্রমিক হিসেবে চাকুরী করা ১৯ খেলোয়াড়েরও। স্থায়ীদের চাকুরী চলে যাওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক। বদলী শ্রমিকরা জানুয়ারী থেকে চাকুরিচ্যুত থাকায় সাত মাস ধরে বেকার এই খেলোয়াড়রা। এরা এখন মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। দু’বেলা খাবার যোগাতে এই খেলোয়াড়দের কেউ মাছের ঘেরে মাটি কাটছেন। কেউ চালাচ্ছেন অটোরিক্সা। অন্যের জমিতে কামলা হিসেবে কাজ করছেন কেউ কেউ। গাছ কাটার শ্রমিক, কাঠমিস্ত্রীর কাজও করেছেন কয়েকজন খেলোয়াড়। দুই মহিলা খেলোয়াড়কে পাওয়া গেল যারা ডিম বিক্রি করে আর জামা কাপড় সেলাই করে দিন কাটাচ্ছে। এই খেলোয়াড়রা অপেক্ষায় আছেন এরিয়ারের টাকা জন্য। ৩/৪ লাখ টাকা যা পাওয়া যাবে তা দিয়ে ফের জীবন বদলানোর স্বপ্ন।

বিজেএমসির বদলী শ্রমিক হিসেবে কাজ করে সপ্তাহে ১৮শত টাকা হিসেবে মাসে ৭ হাজার টাকা করে বেতন পেতেন এই ক্রীড়াবিদরা। আর এখন অন্যের জমিতে বা বাড়ীতে কাজ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। ডেমরার করিম জুট মিলে চাকুরী করতেন ৩০০০, ৫০০০ এবং ১০০০০ মিটারের দৌড়বিদ আল আমিন। ২০১৭ সালের জাতীয় অ্যাথলেটিক্সে ১০ হাজার মিটারে চতুর্থ হওয়া যশোরের অভয়নগরের এই ছেলের এখন জীবন চালাতে হচ্ছে মাছের ঘেরে মাটি কাটার শ্রমিক হিসেবে। তিন বছর আগে বিজেএমসিতে চাকুরী নেয়া ২২ বছর বয়সী আল আমিন জানান, ‘যে দিন কাজ থাকে সেদিন মাটি কাটার মজুরী হিসেবে পাই ৩/৪ শত টাকা। ধান কাটা এবং ধান মাড়াই এর কাজও করেছি।’ এইচএসসি পাশ এই অ্যাথলেট তথ্য দেন আমার চাকুরীর অফার ছিল সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশ জেল দলে। কিন্তু থেকে গিয়েছিলাম বিজেএমসিতেই। হঠাৎ চাকুরী হারানোর খবরে খুব অসহায় হয়ে পড়ি। কাজের অভাবে ২/১ দিন না খেলেও থাকতে হয়।

লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে চাকুরী করতেন বুলবুলি খাতুন। ৮০০, ১৫০০ এবং ৩০০০ মিটার ইভেন্টের এই দৌড়বিদ চাকুরী হারানোর পর বাগেরহাটে অসুস্থ এক বয়স্ক আত্মীয়কে ব্যায়াম করিয়ে মাসে এক হাজার পেতেন। করোনায় তার সেই কাজও বন্ধ। করোনার কারণে রাস্তা ঘাটে উঠা নিষিদ্ধ থাকায় অটো রিক্সা চালানোও বন্ধ ছিল তার স্বামী বিজেএমসির সাবেক অ্যাথলেট মেহেদী হাসান রাজার। এখন অবশ্য রাজা একটি হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের সহকারী হিসেবে কাজ করছেন। জানান বুলবুলি।

জাতীয় সাইক্লিংয়ে পাঁচ স্বর্ণ জয়ী ইয়াসিন হোসেন। বাংলাদেশের হয়ে অংশ নিয়েছেন ২০১৬ সালের শিলং-গৌহাটি এস এ গেমস এবং ২০১৪ সালের গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে। এখন তিনি বেকার নরসিংদীর ইউ এন সি জুট মিলের চাকুরী হারিয়ে। জীবন চালাতে অন্যের জমিতে কামলার কাজ করেছেন তিনি। যশোরের বাঘারপাড়ার ছেলে এই সাইক্লিষ্টের দেয়া তথ্য, আমি অন্যের জমিতে কাজ করে দিনে তিনশত টাকার মতো পাই। এই দিয়েই চলছে জীবন।

আরেক সাইক্লিষ্ট যশোরের অভয়নগরের নুরুল ইসলাম এখন কাঠ মিস্ত্রী। নরসিংদীর ইউ এন সি জুট মিলে কাজ করা এই খেলোয়াড়ের ভান্ডারে আছে ৮টি স্বর্ণসহ ১৫ টি পদক। জানান, ‘চাকুরী চলে যাওয়ার পর আমি এখন ফার্নিচার বানানোর কাজ করি। এছাড়া অন্য কাজও করছি পেটের দায়ে।’ দিনাজপুরের মাসুদ রানা সাইক্লিষ্ট হিসেবে চাকুরী করতেন রাজশাহী জুট মিলে। জাতীয় সাইক্লিংয়ে একটি করে স্বর্ণ, রৌপ্য এবং ব্রোঞ্জ জেতা মাসুদ রানাকে এখন কখনও কাঠুরে, কখনও কৃষি জমির শ্রমিক হিসেবে পাওয়া যায়। মাসুদ রানার দেয়া তথ্য , গাছ কাটার কাজ করলে একটু বেশী মানে ৫ শত টাকা পাওয়া যায়। আর জমিতে সার ছিটোনা, আইল ঠিক করা এবং আগাছা পরিস্কার করলে জোটে তিন সাড়ে তিনশত টাকা।

বিজেএমসির মহিলা ভলিবল দলের খেলোয়াড় রাজশাহীর আশা খাতুনের চাকুরী ছিল হাফিজ জুট মিলে। ২০১৯ কাঠমান্ডু- পোখরা এস এ গেমসে বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধিত্ব করা আশার দিন কাটছে এখন সেলাই মেশিন চালিয়ে। জানালেন, ‘আমার চাকুরীর টাকায় চলতো মা, ছোট বোন ও ছোট ভাইকে সংসার। চাকুরী চলে যাওয়ার পর এখন জামা কাপড় সেলাই করে জীবন চালাচ্ছি। বাসা ভাড়ার টাকা যোগাতে ছোট ভাইটি একটি গাড়ীর গ্যারেজে কাজ করছে।’ আরেক ভলিবল খেলোয়াড় খুলনার রুবিনা সুলতানা রানুর কর্মস্থল ছিল খুলনারই ইর্স্টান জুট মিল। চাকুরী হারিয়ে রানু পরবর্তীতে ২ হাজার টাকা পুঁজি খাটিয়ে ডিম আর দুধের ব্যবসায় শুরু করেছেন। এ দিয়ে দিনে এক দেড়শত টাকা লাভ হয় তা দিয়েই চলছে আমাদের সংসার। বললেন রানু।

এই ক্রীড়াবিদরা এখন এরিয়ার বিলের অপেক্ষায়। ২০১৫ সালে ঘোষিত নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী এদের বেতন ডাবল হয়েছে। এই টাকা সকল বদলী শ্রমিক হিসেবে চাকুরী করা ক্রীড়াবিদদের সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেয়া হবে। এ জন্য তাদের কাগজ পত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। জানান বিজেএমসির স্পোর্টস অফিসার আবদুল কুদ্দুস।

Leave a Reply